ফরিদপুরের সালথার একজন দিনমজুরের সন্তান মো. মোশারফ শেখ—এক সময় হোটেলের বাবুর্চি, এখন কোটি টাকার মালিক। ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় ১৯৯৬ সালে, যখন তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসায় বাবুর্চির চাকরি পান। এরপরই শুরু হয় তার বিত্ত-বৈভবের উত্থান।
দারিদ্র্যপীড়িত একটি পরিবার থেকে আসা মোশারফ শেখের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না বললেই চলে। নিজের নাম পর্যন্ত সই করতে না জানলেও আজ তার নামে রয়েছে একাধিক জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও গাড়ি। অথচ বাবার থেকে পাওয়া ছিল মাত্র ৫ শতাংশ জমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠলেও উঠেছে নানান অভিযোগও—বিশেষ করে নিজ গ্রামের নিরীহ মানুষের জমি দখল ও হয়রানির ঘটনায়।
কৃষকের অভিযোগ: ভয়ভীতি ও জমি দখল
বড় কামদিয়া গ্রামের কৃষক মো. চাঁনমিয়া ফকিরের ছেলে সাগর মিয়া লিখিত অভিযোগে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে মোশারফ জোরপূর্বক তাদের ৪৩ শতাংশ জমি দখল করে তাতে পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। জমি ছাড়ার অনুরোধে হুমকি, গালিগালাজ ও এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
চাঁনমিয়ার ভাতিজা সেন্টু ফকির বলেন, “আমার চাচা একজন দরিদ্র কৃষক। মোশারফ আমাদের জমি দখল করে ঘর নির্মাণ করেন এবং তার ঘরের চালের উপর একটি নৌকা টানিয়ে রাখেন। আমরা বারবার পুলিশের কাছে গেলেও কোনো প্রতিকার পাইনি। বরং প্রতিবাদ করলেই মামলা দিয়ে হয়রানি করতেন।”
গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব, পরিবারেও অশান্তি
প্রতিবেশী মো. জামাল শেখ জানান, “মোশারফের বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালাতেন। নিজে কখনো পড়াশোনা করেননি। কিন্তু শেখ হাসিনার বাবুর্চি হওয়ার পর হঠাৎই অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।”
তিনি আরও জানান, মোশারফ বর্তমানে কামদিয়ায় ২ বিঘা জমিতে একটি বাড়ি এবং মাঠে ৩ বিঘা জমি, ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দীতে ১২ শতাংশ জমির উপর বাড়ি এবং রাজবাড়ি রাস্তামোড়ে আরও ৮ শতাংশ জমির উপর আরেকটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া, তার নামে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ও গাড়িও রয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় মোশারফ শুধু প্রতিবেশীদের উপরই নয়, নিজের পরিবারের উপরও নিপীড়ন চালিয়েছেন। চার বছর আগে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে আটকে রেখে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তিনি। আজও সেই স্ত্রী বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
ক্ষমতার দাপটে ‘সালিশ বাণিজ্য’ ও প্রতিপক্ষের মুখোমুখি
স্থানীয় সূত্র জানায়, ক্ষমতার বলয়ে মোশারফ গ্রামে সালিশ বাণিজ্য ও জমি দখলের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও যুবলীগ নেতা নুর ইসলামের প্রতিরোধে তা পুরোপুরি সফল হয়নি। ২০১৫ সালে গ্রামবাসীর ধাওয়ায় এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয় তাকে। পরে আবারও নুর ইসলামের সঙ্গে সমঝোতা করে তিনি নিয়ন্ত্রণে ফেরার চেষ্টা করেন।
দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানের দাবি
ফরিদপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, “একজন বাবুর্চির আয় দিয়ে এত সম্পদ গড়া সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি। সরকার এখন তার সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখুক, এটাই জনস্বার্থে জরুরি।”
পুলিশের বক্তব্য
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান বলেন, “মোশারফের বিরুদ্ধে জমি দখলের একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ
মোশারফের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। এমনকি গ্রামে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন